বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পালকি এখন বিলুপ্তির পথে

বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ॥ “পালকি চলে! পালকি চলে! গগন তলে আগুন জ্বলে! স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গাঁয়ে যাচ্ছে কারা রুদ্র সারা!”। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘পালকির গান’ কবিতাটি গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য পালকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাহক পালকির কথা । দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দেয়ার জন্য পালকি ছিল প্রাচীনকালে জনপ্রিয় মাধ্যম।

তবে বিয়ের উৎসবে পালকির কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। একটা সময় ছিল, যখন গ্রাম বাংলার এমনকি শহরের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে ও পালকি চাই পালকি চাই বলে ধুম পড়তো।

যেন পালকি ছিল এক আভিজাত্যের প্রতীক। নতুন বধূকে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়াই ছিল দাম্ভিকের। পালকি যেন ছিল গ্রাম্য মেয়েদের বহুদিনের প্রেম প্রীতি আর ভালবাসার স্বপ্ন। নারীদের আবেগ অনুভূতির সঙ্গে জড়িত ছিল পালকি। পালকি ছাড়া গ্রামের বিয়ে কল্পনা করা যেত না। পালকি সাধারণ তিন ধরনের হয়ে থাকে। সাধারণ পালকি, আয়না পালকি এবং ময়ূরপক্সক্ষী পালকি। সাধারণ পালকি ছিল আয়তকার। চারদিকে কাঠ দিয়ে আবৃত এবং ছাদ ঢালু।এর দুদিকে দরজা থাকতো।

আয়না পালকিতে আয়না লাগানো থাকত। ময়ূরপক্সক্ষী ছিল আয়তনে সবচেয়ে বড়। এর ভেতরে বসার জন্য পালঙ্কের মতো আসনও করা হতো। পালকিগুলোতে পাখি, পুতুল, লতাপাতা ও আকর্ষণীয় কারুকার্য নকশা করানো থাকত।চার কোণাবিশিষ্ট পালকি বহন করতো চার/ছয় জন সুঠাম দেহের পুরুষ। যারা বেয়ারা নামে পরিচিত ছিল। দূরত্বভেদে বেয়ারাদের হাতে শোভা পেত লাঠি কিংবা দেশীয় কারুকার্য পূর্ণ বিভিন্ন ধরনের লাঠি। তারা পালকি নিয়ে ‘হুনহুনা’, ‘হুনহুনা’ ধ্বনিতে তালে তালে পা ফেলে, সুরেলা ছন্দময় ধ্বনিতে তাদের গন্তব্যের দিকে ছুটে চলত। গ্রামীণ সেই চেনা আঁকাবাঁকা, মেঠো পথে বেয়ারারা নববধূকে বরসহ শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া আসা করত। বেয়ারাদের হুনহুনা ধ্বনিতে মুখরিত দৃশ্য দেখতে পথের ধারে জড়ো হতো গায়ের বধূসহ, মা-চাচি এমনকি উঠতি বয়সের চঞ্চল মেয়েরাও।

নবীন-প্রবীণ, তরুণ-তরুণী, বালক-বালিকাদের হৈ-হুল্লোড় আর দুষ্টুমিতে এক আনন্দঘন মুহূর্তে সৃষ্টি হতো। পালকিতে বসে থাকা নববধূকে দেখে তারাও হারিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে রাজকুমারকে নিয়ে। পালকি ঘিরে কত হাসি, তামাশা, গল্প সে যেন এক বিমোহিত পরিবেশ। মানব চাকা ব্যবহার করে পালকি চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মাইলের পর মাইল।সভ্যতার ক্রমবিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, বিজ্ঞানের আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে বাঙালি ঐতিহ্যের প্রতীক পালকির প্রচলন।

বিজ্ঞাপন

এখন আর আগের মতো পালকির ব্যবহার চোখে পড়ে না। মেয়েরা আর পালকিতে চড়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখে না। বিয়েতে পালকির সেই স্থান দখল করে নিয়েছে জাঁকজমকে সাজানো প্রাইভেটকার।ইতিহাসের পাতায় দেখা একসময় অভিজাত শ্রেণির মানুষ ও রাজরাজাদের ও প্রধান বাহক ছিল পালকি। রকমারি ও বাহারি রূপে ছিল পালকি। পালকির ব্যবহার কখন কীভাবে এ দেশে শুরু হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। তবে মোগল, পাঠান আমলে বাদশা, সুলতান, বেগম ও শাহজাদিরা পালকিতে যাতায়াত করত।

বিজ্ঞাপন

মুসলিম সম্প্রদায় মেয়েদের পর্দা রক্ষার জন্য পালকিতে চড়ে অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে বাড়ির বাইরে যাতায়াত করত। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রাচীনকালে তাদের বউ মেয়েদের যাতায়াতের জন্য পালকি ব্যবহার করত। বিলাসী পরিবারগুলোতে নিজস্ব পালকি ও নিজস্ব বেয়ারা রাখত। অন্যদিকে নিম্নমধ্যবিত্তদের ও যাতায়াতের জন্য ভাড়া চালিত পালকি ব্যবহার করত। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এবং চতুর্দশ শতকের পর্যটক ম্যাগনোলি ভ্রমণের সময় পালকি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়।

বিজ্ঞাপন

দেশে সড়ক ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পায়ে চালিত পালকির কদর কমে যায়। ১৯৩০ এর দশকে শহর অঞ্চলের রিকশার প্রচলন হওয়ার পর থেকে পালকির ব্যবহার উঠেই গেছে। পালকির বদলে যাতায়াতের জন্য এখন সহজ যানবাহনের পথ বেছে নেয়েছে। কালক্রমে ঐতিহ্যের বাহক পালকি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। রাজা নেই, বাদশা নেই, নেই পালকির বেয়ারারা। কোথায় হারিয়ে গেল সেই সময়। এখনকার বধূরা আর পালকিতে চড়ে লাজরাঙ্গা মুখে শ্বশুর বাড়ি যায় না।

বিজ্ঞাপন

তবে কেউ কেউ শখের বশে পালকির আয়োজন করে, যাতে বিয়ের অনুষ্ঠানে নতুনত্ব আসে। কেউবা নাটক-সিনেমায় ব্যবহার করার জন্য পালকির খোঁজ করে। তবে আগের মতো পালকির সেই আমেজ আর চোখে পড়ে না। কিন্তু এখনও কোথাও কোথাও পালকি দেখা যায় । বিশেষ করে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে লোক ও কারুমেলায় বর-কনের বিয়ে অনুষ্ঠানে প্রকৃত পালকির অনুরূপ ককশিট দিয়ে বানানো পালকি দেখা যায়।

গ্রামবাংলার এ প্রাচীন বাহন পালকি সংরক্ষণ করতে হবে।তা না হলে বাংলার এ ঐতিহ্যময়ী পালকি স্থান নেবে জাদুঘরে কিংবা বইয়ের পাতায়। সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন আমাদের নতুন প্রজন্মকে পালকি দেখতে লোকশিল্প জাদুঘরে যেতে হবে কৃত্রিমভাবে সাজানো পালকি দেখার জন্য।গ্রাম বাংলার গ্রামিন ঐতিহ্য পালকি আজ বিলুপ্তির পথে। বাংলার এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আমাদের সবার মনভাব ও দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে হবে।তাহলেই হয়তোবা গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পালকি ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব।

এস,এম,আব্দুল মান্নান/আরইউ

বিজ্ঞাপন
আরো দেখুন
বিজ্ঞাপন

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published.

বিজ্ঞাপন
এই সংবাদটিও পড়ুন
Close
Back to top button